outbin.com.bd

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কাকে বলে এবং এর গুরুত্ব

Moontaser Nahar

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কাকে বলে?

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনে একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, লিঙ্কডইন, ইউটিউব ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে সংযুক্ত করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে ব্যবসার প্রসার ও প্রচারণার জন্য ব্যবহৃত কৌশল হলো সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং বা Social Media Marketing (SMM)। এটি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যার মাধ্যমে ব্র্যান্ড সচেতনতা তৈরি, পণ্য বা সেবার প্রচারণা এবং গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি?

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যবসায়িক বার্তা, পণ্য বা সেবার প্রচারণা এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকর্ষণ করার প্রক্রিয়া। এটি কনটেন্ট তৈরি, শেয়ার করা, বিজ্ঞাপন প্রচার করা, এবং গ্রাহকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ব্র্যান্ড সচেতনতা বৃদ্ধি করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবসায়ের উপস্থিতি তৈরি করে বিক্রি বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য।

 SMM (Social Media Marketing) প্ল্যাটফর্মসমূহ:

  1. Facebook– সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম, যেখানে পেজ, গ্রুপ, বিজ্ঞাপন এবং লাইভ ভিডিও ব্যবহার করে মার্কেটিং করা যায়।
  2. Instagram – ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ভিত্তিক মার্কেটিং যেমন ছবি, স্টোরি, রিলস-এর মাধ্যমে তরুণ ব্যবহারকারীদের টার্গেট করা যায়।
  3. LinkedIn – B2B মার্কেটিং ও প্রফেশনাল কানেকশন বৃদ্ধির জন্য আদর্শ।
  4. Twitter – সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে দ্রুত আপডেট ও ট্রেন্ডিং টপিক নিয়ে আলোচনার জন্য উপযুক্ত।
  5. YouTube – ভিডিও মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ড কাহিনি বলার জন্য অসাধারণ মাধ্যম।
  6. TikTok – শর্ট ফর্ম ভিডিও মার্কেটিং এর নতুন ট্রেন্ডসেটার।

 

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর প্রধান কাজগুলো কি?

১. ব্র্যান্ডিং ও পরিচিতি বৃদ্ধি করা

সোশ্যাল মিডিয়া হল ব্র্যান্ড সচেতনতা তৈরির প্রথম ধাপ। উদাহরণস্বরূপ, একটি স্থানীয় কফিশপ নিয়মিত ইন্সটাগ্রামে তার প্রতিদিনের স্পেশাল কফির ছবি পোস্ট করলে, ছবি দেখে মানুষ প্রথমেই সেই দোকানটির কথা মনে রাখে। এতে শুধুমাত্র সচেতনতা নয়, ‘পরিচিতি’ ও মানসিক সংযোগ গড়ে ওঠে। আর যখন যে মনে পড়ার ক্ষমতা বাড়ে, তখন নতুন গ্রাহক আসার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

২. বিক্রয় বৃদ্ধি এবং নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করা

যখন তুমি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে টার্গেটড বিজ্ঞাপন দাও—যেমন: “ঢাকায় ফ্রি কফি ডেলিভারি”—তাহলে একই ইন্টারেস্ট বা এলাকা থেকে আগ্রহী ব্যবহারকারীরা সরাসরি গ্রাহক হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ১০০০ টাকায় ৫০০ মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের মধ্যে ১০ জন অর্ডার করলে, তা প্রায় ঝুলিত রিটার্ন।

৩. গ্রাহকদের সাথে সম্পর্ক তৈরি ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা

মনোযোগ আকর্ষণ করাটা যথেষ্ট নয়; গ্রাহক যেন সহজেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা বা সমস্যা জানাতে পারেন—এটাই সম্পর্ক গড়ার মূল। প্রতিটি মেসেজ ও কমেন্টে প্রম্পট উত্তর দিয়ে তুমি গ্রাহকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবে। যেমন: “গল্প” স্টোরিতে একজন গ্রাহক জিজ্ঞেস করলে, সেল্ফি দিয়ে উত্তর দিলে তার ইমপ্রেশন অনেক বেশি مثبت হবে।

৪. পণ্য ও সেবা সম্পর্কে গ্রাহকের মতামত ও ফিডব্যাক নেওয়া

“তোমার পছন্দের ফ্র্যাভারিট ফ্লেভার কোনটি?”—একটি পোল চালিয়ে সরাসরি ইনপুট নেওয়া যায়। গ্রাহক জানতে পারছে তার কথার মূল্য দেওয়া হয়েছে, আর তুমি কেমন ধরনের পণ্য বা সার্ভিস জনপ্রিয়—তারও ধারনা পাবে।

৫. সাইটের ট্রাফিক বৃদ্ধি করা

একটি ব্লগ পোস্টের লিংক ফেসবুক স্টোরি ও টুইটার পোস্টে শেয়ার করলে, আগ্রহীরা সরাসরি উইেবসাইটে চলে আসে। এতে SEO–তে সাহায্য হয় এবং Google র‌্যাংকেও প্লাস পয়েন্ট। প্রতিটি ক্লিক তোমার সাইটের ভ্যালু বাড়ায়।

৬. সম্ভাব্য গ্রাহকদের সাথে নিয়মিত সংযোগ স্থাপন করা

“মাসিক ডিজাইন টিপস”, “গ্রাহকের সফল গল্প”—এ ধরনের কনটেন্ট শেয়ার করে তুমি নিয়মিত তাদের মনে থাকতে পারবে। এতে তারা রূপান্তর না-ও হতে পারে, কিন্তু ‘স্থানীয় গ্রাহক’ হিসেবে ধরে রাখার সুযোগ থাকে।

৭. পণ্য বা সেবা সম্পর্কে তথ্য প্রদান ও সচেতনতা তৈরি করা

অনলাইনে রিভিউ বা টেসটিমোনিয়াল নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করলে—যেমন “আমাদের সফটওয়্যার দিয়ে বছরে ৪০% সময় বাঁচান”—এতে নতুন গ্রাহকরা বুঝতে পারে পণ্যটি কীভাবে সাহায্য করবে।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর গুরুত্ব

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এর মূল কারণগুলো হলো:

১. খরচ কম: ঐতিহ্যবাহী মার্কেটিংয়ের তুলনায় খরচ অনেক কম, কিন্তু ফলাফল অনেক বেশি।

২. টার্গেটেড বিজ্ঞাপন: নির্দিষ্ট বয়স, অঞ্চল, আগ্রহ অনুযায়ী টার্গেট করে বিজ্ঞাপন চালানো যায়।

৩. ব্র্যান্ডের বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি: নিয়মিত সক্রিয় থাকার মাধ্যমে ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি পায়।

৪. দ্রুত ফলাফল: সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

৫. গ্রাহকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ: সরাসরি গ্রাহকের সমস্যা সমাধান ও প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সুযোগ থাকে।

SMM এর অংশ কি কি?

১. কনটেন্ট তৈরি

ব্লগ, ছবি, ভিডিও এবং গ্রাফিক্স তৈরি ও শেয়ার করা।

২. বিজ্ঞাপন প্রচারণা

পেইড বিজ্ঞাপন পরিচালনা করে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে টার্গেট করা।

৩. কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট

সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ও কমিউনিটি তৈরি করা।

৪. মনিটরিং ও অ্যানালিটিক্স

ক্যাম্পেইনের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ এবং পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং করা।

৫. ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং

জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের প্রচারণা চালানো।

ছোট ব্যবসার জন্য SMM এর উপকারিতা

ছোট ব্যবসাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই কম খরচে তাদের ব্র্যান্ডকে প্রচার করতে পারে। স্থানীয় ও নির্দিষ্ট গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দ্রুত ব্যবসা প্রসারিত করতে পারে। নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব।

১. বাজেট বান্ধব: স্বল্প খরচে প্রচারণা চালানো যায়।

২. লোকাল টার্গেটিং: স্থানীয় গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা যায় সহজেই।

৩. ব্র্যান্ড পরিচিতি বৃদ্ধি: দ্রুতই ব্র্যান্ডকে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

৪. সহজে গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা: সরাসরি মেসেজ বা কমেন্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।

৫. প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে থাকা: নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকলে বাজারে দ্রুত স্থান তৈরি করা যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর ভবিষ্যৎ

আগামীতে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং আরো শক্তিশালী হবে। ভিডিও কনটেন্ট, লাইভ স্ট্রিমিং, চ্যাটবট, অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। তাই ভবিষ্যতের মার্কেটিংয়ে টিকে থাকতে হলে এখনই SMM-কে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা উচিত।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর সাধারণ ভুল এবং তা এড়ানোর উপায়:

  1. অসামঞ্জস্যপূর্ণ পোস্টিং – সমাধান: কনটেন্ট ক্যালেন্ডার ব্যবহার করুন।
  2. শুধু বিক্রয়কেন্দ্রিক কনটেন্ট – সমাধান: বিনোদনমূলক, শিক্ষামূলক এবং সচেতনতামূলক কনটেন্ট মিশিয়ে দিন।
  3. গ্রাহক প্রতিক্রিয়াকে উপেক্ষা করা – সমাধান: প্রতিটি কমেন্ট/মেসেজ মনোযোগ দিয়ে উত্তর দিন।

 

বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ

“সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি” এই বিষয়ে আপনার মনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে? তাহলে চলুন জেনে নেই সেই সকল প্রশ্ন ও উত্তরগুলো-

SMM কি শুধু অনলাইন ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয়?

এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। SMM কেবল অনলাইন নয়, অফলাইন ব্যবসার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অফলাইন ব্যবসায় আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন অফার, ডিসকাউন্ট, লোকাল ক্যাম্পেইন চালানো যায়। এমনকি, যেসব ব্যবসা শারীরিকভাবে দোকান বা অফিস পরিচালনা করছে, তাদের জন্যও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত সক্রিয়তা গ্রাহক ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

উপসংহার

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ব্যবসার বৃদ্ধিতে এখন অপরিহার্য মাধ্যম। বাজেটের মধ্যে থেকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটি সর্বোত্তম উপায়। প্রতিটি ব্যবসায়ীরই উচিত SMM কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা। ব্যবসার ধরন যা-ই হোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি থাকা জরুরি। তাই SMM সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝে কাজে লাগান, সফলতা আসবেই।

Leave a Comment